এক নামাজী ব্যাক্তির ঘটনা

গত শুক্রবারের ঘটনা  ১১টার দিকে হানিফ পরিবহনে উঠলাম। আমার কোণাকুণি সামনের সিটে বসেছেন হুজুরটাইপ একজন লোক। তিনি বাস ছাড়ার পরপরই সুপারভাইজারকে বললেন ভাই আমি জুম্মা পড়বো। নামাজের খুতবার আগে দাঁড়াবেন। সোয়া ১ টায় দাঁড়ালেই চলবে। বাস যখন চৌদ্দগ্রাম বাজার পার হচ্ছে তখন সোয়া ১টা। তিনি উঠে গিয়ে সুপারভাইজারকে বললেন “ভাই সোয়া ১টা বাজে,দাঁড়ান না! খুতবা না শুনলে জুমা সম্পূর্ণ হয় না!”

আমার তখন চোখে ঘুম ঘুম ভাব। হালকা করে কানে বাজছে ভদ্রলোকের সাথে সুপারভাইজারের বাতচিত। শুধু সুপারভাইজার না আরো কয়েকজন যাত্রী বলছে নামাজ দেড়টায়। ১টা পঁচিশে দাঁড়ালেই হবে।

বাসের সে যাত্রীদের মত আমি/আমরা অনেকেই জুমার নামাজ পড়াটাকে দায়সারা গোছের বানিয়ে ফেলেছি। শুক্রবার দুপুরে খুতবার শেষ দিকে মসজিদে ঢুকি ও ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর কত দ্রুত মসজিদ থেকে বের হওয়া যায় সে রাস্তা খুঁজি।

আমি চোখ খুলেই বললাম সুপারভাইজার সাহেব, বাস দাঁড় করান। ওযু করার একটা সময়ও লাগবে তো! ভদ্রলোক বললেন আমার ওযু আছে ভাই। অন্যদের অব্যাহত ১টা পঁচিশ দাবির মুখে আমার কন্ঠ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। বাস ড্রাইভার একটা পঁচিশে দেখেন রাস্তার পাশে মসজিদ পাচ্ছেন না! আরো মিনিট তিনেক পর ফেণীর ফতেহপুরের দিকে একটা মসজিদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। ততক্ষণে নামাজ প্রায় শেষ!

ভদ্রলোক দৌড়ে গিয়ে নামাজ ধরতে ধরতে ইমাম সাহেব সালাম ফিরিয়েছেন! বাসে এতগুলো পুরুষ মানুষ। কারো কোন বিকার নেই শুধু ওই ব্যক্তি ছাড়া। আমি বাসের জানালা দিয়ে কড়া রোদে দাঁড়িয়ে তাকে নামাজ আদায় করতে দেখছি। জুমা মিস করে ফেলায় সম্ভবত যোহরের নামাজ আদায় করছিলেন।

এতক্ষণ বাস একটা পঁচিশে দাঁড়াতে বলা লোকগুলো দ্রুত আশেপাশে চা দোকান খোঁজা শুরু করলো। কেউ কেউ বেনসন সিগারেট না পাওয়ায় বিরক্ত। গ্রামের দোকানে বেনসন না পাওয়া শীর্ষক হতাশা শুনলাম দুজনের গলায়। একজন বিস্কুট কীভাবে পাঁচ টাকা পিস হয় তা নিয়ে দোকানদারের সাথে ঝগড়া করছে।

এক মহিলা বাচ্চার জন্য চিপস কিনতে এসেছেন। শুকনা সুপারি দিয়ে পান খাচ্ছেন দুজন। আর আমি জানালা দিয়ে ওই আল্লাহর বান্দাকে দেখছি। সুপারভাইজার তখন ইমাম সাহেব কেনো নামাজ তাড়াতাড়ি শুরু করেছেন এটা নিয়ে রাগে গজগজ করছেন! দশ মিনিট পর বাস ছাড়লো। সুপারভাইজার বারবার লোকটাকে শুনিয়ে বলছিলো “আইজকা আগে দাঁড়াই গেছে ইমাম সাব।”

আমি ভেবেছিলাম ভদ্রলোক খুব রেগে যাবেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি একটা কথাও বলেননি। শুধু মাথা নিচু করে নিজের আসনে বসে ছিলেন। আমার কোণাকুণি সামনের সিটে বসেছিলেন বলে আমি তাকে দেখছিলাম।

পুরোটা পথ আর মাথা তোলেননি। সুপারভাইজারও আর কিছু বলেননি। শুধু মসজিদ্দা স্কুল পার হওয়ার সময় বলেছিলেন আমাকে রয়েল সিমেন্ট কোম্পানির সামনে নামাই দিয়েন। ভদ্রলোক উঠে সামনে যাচ্ছিলেন। সুপারভাইজার তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো ভাই কিছু মনে করিয়েন না!

লোকটা আমাকে সর্বোচ্চ অবাক করে দিয়ে সুপারভাইজারের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কাঁপিয়ে দুই চোখে পানি ঝরিয়ে দিয়ে বললো –

“ভাই জুমার নামাজটা পড়তে পারলাম না!”

একজন বাবা তার দুই দশক ধরে লালিত পালিত একমাত্র কন্যাকে পাত্রস্থ করার সময় “আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো” বলতে যেভাবে কাঁদে একজন মানুষ এক ওয়াক্ত জুমার নামাজ পড়তে না পেরে যেনো তেমন আবেগেই কথাটা বললো!

একটা উপদেশ দিয়ে শেষ করিঃ

এখনও সময় আছে নামাজকে ভালোবাসুন নামাজীদের ভালোবাসুন ইনশাআল্লাহ জান্নাত আপনার হয়ে যাবে এবং নিজে নামাজ পড়তে না পারলেও কখনও অন্যের নামাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেন না,প্রয়োজনে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করুন♥

পূর্ব-পশ্চিমে মুখ ফেরালেই সেটা ধার্মিকের মতো কাজ হয়ে গেল না। বরং সত্যিকারের ধার্মিকতা হচ্ছে: যারা আল্লাহর تعالى প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং বিচারের দিন, ফেরেশতাগন, সব কিতাব এবং নবীদের প্রতি বিশ্বাস রাখে। যারা নিজেদের সম্পদকে ভালোবাসার পরেও তা দান করে নিকটজনকে, এতিম, মিসকিনকে, বিপদে পড়া ভ্রমণকারীদেরকে, যারা সাহায্য চায় তাদেরকে এবং দাস-যুদ্ধবন্দিদের মুক্ত করার জন্য দান করে

যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, কথা দিয়ে কথা রাখে; দুর্দশা-দারিদ্রতা, অসুস্থতা-কষ্ট এবং ভীষণ কঠিন সময়েও ধৈর্যধারণকারী। —এরাই নিজেদেরকে প্রমাণ করেছে, আর এরাই সত্যিকারের তাকওয়া অর্জন করতে পেরেছে। [আল-বাক্বারাহ ১৭৭]

One thought on “এক নামাজী ব্যাক্তির ঘটনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *