একজন মায়াবতীর প্রেমের গল্প ২০২২

(প্রেমের গল্প ২০২২) বাসা থেকে আমাকে বলা হয়েছে আমি যেন ত্রপা নামের মেয়েটির সাথে ফোনে কথা বলি, ভাব করি এবং মাঝেমাঝে বাইরে ঘুরতে যাই। আমার পড়াশুনা শেষ হবার পরে যখন বাসার মুরুব্বিদের মনে হল যে এখন আমি যথেষ্ট পরিমাণ রোজগার করি,এবার ঘরসংসারের দিকে আমার মন বসানো দরকার, তখন মোটামুটি সবার ঘুম হারাম হয়ে গেল এবং আমার জন্য একজন সর্বগুণসম্পন্না পাত্রী খুঁজতে সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বেশি না, মোটামুটি জনাবিশেক পাত্রী দেখার পর সবার মনে হল,আমার জন্য ত্রপা নামের মেয়েটিই সবচেয়ে উপযুক্ত; যদিও আমি মেয়েটির উপযুক্ত কিনা এই ব্যাপারটি ভাবার কথা সম্ভবত কারো মাথায় আসে নি।

ত্রপাদের বাসার মুরুব্বিদের কথা জানি না; তবে এইটুকু জানি,যে আগামী মাসের সাতাশ তারিখ আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে। শুধু বিয়ে ঠিক করে তাঁরা ক্ষান্ত হন নি; আমরা রেগুলার ফোনে কথা বলছি কিনা, একসাথে বাইরে খেতে যাচ্ছি কিনা, বিয়ের শপিং এর প্ল্যান এখনো করছি না কেন,ইত্যাদি বিষয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা দেখে আমি কনফিউজড হয়ে যাই।

আমাদের দুইজনের মধ্যে ভাব ভালবাসা বাড়ানো কর্মসূচীর একটি অংশ – আজকে ত্রপার সাথে আমাকে কফি খেতে যেতে হবে। বড়ভাবী আমাকে দিয়ে জোর করে ত্রপাকে ফোন করালেন। ত্রপাকেও মনে হয় আভাস দেয়া হয়েছে, সে ফোন ধরেই বললো, জানি,বাইরে যেতে হবে। কোথায় আসবো বলেন!

সুন্দর প্রেমের গল্প

আমি থতমত খেয়ে বললাম, “ইয়ে,না,আসলে ব্যাপারটা এমন না। আসতেই হবে এমন কোন কথা নেই। আপনার ইচ্ছা না হলে আসার দরকার নেই।“

“আপনার আমার ইচ্ছা অনিচ্ছায় কিছু যায় আসে না। কোথায় আসবো বলেন। বিকাল পাঁচটার মধ্যে চলে আসবেন দয়া করে। সন্ধ্যার পরে আমার নিজের কিছু কাজ আছে।“

“অবশ্যই,দেরি করবো কেন?আমি ঠিক পাঁচটায় চলে আসবো। একদম কাঁটায় কাঁটায়!”

দুই ভাবী চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছেন দূর থেকে,ভাবছেন না জানি কী প্রেমালাপ করছি। ধমক না দিয়ে ত্রপা আমার সাথে কথা বলে না,এই কথা উনাদের বলার সাহস বা প্রয়োজন,কোনটাই নেই বলে আমার ধারণা।

আমি বুঝতে পেরেছি,কোন কারণে আমাকে মেয়েটার পছন্দ হয় নি। কিন্তু সে তার বাসায় আমাকে নিয়ে আপত্তিও জানায় নি। কফি খেতে বললে যাচ্ছে,শপিং করতে যেতে বললে যাচ্ছে,ফোন করলে কাটাকাটা করে কথা বলছে ঠিক,কিন্তু বলছে। আর আমার কথা জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। এই মেয়েটার মধ্যে মায়া বিস্তারের অদ্ভূত একধরণের ক্ষমতা আছে। আমি সেই মায়ায় পড়ে গেছি।

আমার যাওয়ার কথা বিকাল পাঁচটায়,আমি সাড়ে চারটায় গিয়ে সেখানে বসে রইলাম। ত্রপা এলো পাঁচটা পাঁচে।

আমি বললাম,”কেমন আছেন আপনি?”

ত্রপা কঠিন মুখে বললো,”ভালো আছি।“

কেউ কেমন আছে জানতে চাইলে তাকেও জিজ্ঞেস করতে হয় সে কেমন আছে। ত্রপা আমাকে জিজ্ঞেস করে নি। আমি কেমন আছি সেইটা বলাটা উচিত হবে না মনে হয়। তাই আমি চুপ করে রইলাম। ওয়েটার কফি দিয়ে গেছে। মেয়েটা চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। এই মুহূর্তে তাকে অপরূপ রূপবতী লাগছে। তার সাথে ভাব ভালবাসা থাকলে তাকে সেইটা বলা যেতো। এখন বললে কঠিন গলায় বলবে, “ধন্যবাদ!” এরপর আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাবো।

অস্বস্তি কাটানোর জন্যই বললাম,”আচ্ছা,ত্রপা নামের অর্থ কী?”

”লজ্জা।“

“বাহ!”

বাহ বলার কিছু নেই। এখনো পর্যন্ত যে ছেলেকেই বাসা থেকে দেখেছে, সে প্রথম প্রশ্ন করেছে এইটা। অর্থ বলার পরে আর কোন শব্দ খুঁজে পায় নি, বলেছে – বাহ!খুব সুন্দর নাম!

মিষ্টি প্রেমের গল্প

আমি আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে কফিতে চুমুক দিচ্ছি। মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে এখানে বসে আছি। আমি আগেও দেখেছি,ত্রপা কখনোই নিজ থেকে আমার সাথে কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু তার উত্তর দিয়ে আবার চুপ হয়ে যায়।

ত্রপা বললো,”আপনি কি আরো কিছুক্ষণ বসতে চাচ্ছেন? আজকে আমার বাসায় কাজ আছে কিছু,তাড়াতাড়ি গেলে ভাল হয়।“

বুঝলাম সে চলে যেতে চাচ্ছে। ভাবলাম আমিও উঠবো। কিন্তু হঠাৎই সেই প্রশ্নটা করে ফেললাম,যেটা এতোদিন জিজ্ঞেস করবো করবো করেও করতে পারি নি।

“আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না সেইটা বুঝতে পেরেছি। কারণটা জানতে পারি কি?”

ত্রপা নামের মেয়েটি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি লক্ষ্য করলাম,তার দৃষ্টির কাঠিন্যের মধ্যেও এক ধরণের সৌন্দর্য আছে,তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে,কিন্তু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।

ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে ত্রপা বললো, “আপনাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি না এমন না ব্যাপারটা,আমি আসলে বিয়েই করতে চাচ্ছি না।

“তাও ভাল,আমাকে ফেলে দিচ্ছে না” মনে মনে ভাবলাম। মুখে বললাম,”খুব ব্যক্তিগত প্রশ্ন,তবু বলি,বিয়েটাই করতে চাচ্ছেন না কেন?

একসময় চাইতাম। এখন চাই না।“

পছন্দের কেউ আছে?”

ছিল”,তার অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর।

বুকের ভেতরটা কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে,পছন্দের ছেলে আছে তাহলে! আমিই কাবাব মে হাড্ডি?

ছিল বলছেন যে? এখন নেই?

ত্রপা কিছুক্ষণ সময় নিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে এখনি সে কেঁদে ফেলবে। কিন্তু সে কাঁদলো না। আঙুল দিয়ে টেবিলে আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো, “শুভর সাথে বন্ধুত্ব ক্লাস নাইন থেকে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এই ছেলেটা। সবকিছু একসাথে ছিল। সেইম স্কুল,একই স্যারের কাছে পড়তাম,সেইম নোট শেয়ার করে পড়েছি। আমাদের দুইজনের মধ্যে কোন লুকোছাপা ছিলো না। গল্পের বই,গেইম,মুভি,প্রেম এমনকিছু ছিল না যা নিয়ে কথা বলতাম না। কলেজে ভর্তি হয়ে প্রোপোজ করলো, আমিও দ্বিতীয়বার ভাবিনি। সেও আমার সবকিছু,আমিও তার। ভার্সিটিতে আমি ভর্তি হলাম কেমিস্ট্রিতে,ও গেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। বছর দুয়েকের মধ্যে বাসায় জেনেও গেল। কেউ আপত্তি করে নি।

একসাথে এতোগুলি কথা বলে মেয়েটা শ্বাস নিচ্ছে। আমি ভাবলাম,তাহলে শুভকে নিয়ে ঝামেলা কোথায় হলো! ব্রেক আপ? হতেও পারে! ছোট করে জিজ্ঞেস করলাম,”তারপর?

“দিনগুলি খুব সুন্দর ছিল। আমার পঁচিশ বছরের জীবনে কেউ আমাকে এতোটা বুঝে নাই যতোটা শুভ বুঝতো, কেউ আমাকে ওর মতো করে ভালবাসে নাই।“ আমি দেখতে পেলাম মেয়েটার চোখে পানি,পানি মোছার চেষ্টা সে করছে না। আমার ইচ্ছা করছে পানি মুছে দিতে, শুভ নামটা মনের ভেতর বিঁধে গেছে, দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। এই মেয়েকে ছেড়ে ওই ছেলে চলে গেলো কীভাবে?

সেরা প্রেমের গল্প

প্রেমের গল্প ২০২২

নিজেকে সামলে নিয়ে ত্রপা শুরু করলো, “ওর পাস করতে আর একবছর বাকি তখন। হঠাৎ একদিন ক্লাসে মাথা ঘুরে পড়ে গেলো। প্রায়ই চোখে ঝাপসা দেখতো, অসহ্য রকমের মাথাব্যথা হতো। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে থাকতো। আমি পাশে থাকলে আমাকে খালি বলতো, তুই আমার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাক,আমি তখনই শুধু ব্যথা সহ্য করতে পারি।“

আমি এমন কিছু ভাবতে পারি নি। বললাম,”ডাক্তার দেখান নি?

“ঢাকার সবচেয়ে বড় নিউরোলোজিস্ট দেখানো হয়েছে। ওর রোগটা কিন্তু খুব সিম্পল ছিল। মেনিনজিওমা বলে ঐটাকে। এই অপারেশন নাকি অহরহ হয়,সাক্সেস রেটও অনেক বেশি। আমাদের ভাগ্য খারাপ ছিল কারণ শুভর ক্ষেত্রে এটা হয়েছিল খুব সেন্সিটিভ জায়গায়। রিস্ক ছিল বেশি। ওর বাবা মা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করলেন। সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হলো। লাভ হয় নাই। শুভ আমাকে অপারেশনের আগের রাতে বলেছিল, খবরদার কাঁদবি না। আমি মরে গেলেও কাঁদবি না। আর আমি মরবোও না ,তোকে বিয়ে করবো, দুই হালি বাচ্চাকাচ্চার বাপ হবো, এরপরে না মরে শান্তি! শুভ কথা রাখে নাই। সে দেশে ফিরলো না,তার লাশ ফিরলো।“

মেয়েটা অঝোর ধারায় কাঁদছে। আমি কি ওর মাথায় একটু হাত রাখবো?

পাঁচ মিনিট পর নিজেই সামলে নিয়ে বললো,”আপনি বলতে পারেন,আমার মুভ অন করা উচিত। আমিও বুঝি। বিশ্বাস করেন,আমি পারি না। আমার সাতটা বছরের প্রতিটা মুহূর্ত জুড়ে এই ছেলেটা ছিল। আমি পারি না এই সাত বছরকে ভুলে যেতে। বাসায় কয়েকদিন সময় দিয়েছে আমাকে,সাপোর্টও দিয়েছে। শুভর মা পর্যন্ত এসে আমাকে বলেছেন ত্রপা তুই একটা বিয়ে কর মা। আমি পারি না। শুভ ছাড়া অন্য কারো সাথে এক ছাদের নিচে আছি,ভাবলে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। মানুষজন সোশ্যাল মিডিয়া,ফেসবুকে আমাকে দেখে ভাবে আমি কতো সহজে ওকে ভুলে গেছি, ভেতরের রক্তক্ষরণ কাউকে দেখাতে ইচ্ছা করে না। আপনি নিজে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,তাই এতো কথা বলে ফেললাম আপনাকে।“

মানুষজন আপনাকে নিয়ে কথা বলে?

বলে তো। আমি নাকি দুইদিনের মাথায় সব ভুলে গেছি। যে মেয়ের সাত বছরের প্রেমিক মরে গেছে, তার আবার কীসের ছবি আপলোড করা? কীসের চেক ইন দেয়া? আমি নাকি এক মাসের মাথায় বিয়ে করে হাজব্যান্ডের সাথে হানিমুনের ছবি আপ করবো! কাছের মানুষরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলেছে।

প্রথম প্রেমের গল্প

আমার আর কিছু বলার ছিল না। এই মেয়েটা এতোটা দুঃখ নিয়ে এই পৃথিবীতে একা বাঁচবে কীভাবে? আবারো মনে হলো,শুভ কীভাবে পারলো অসম্ভব মায়াবতী এই মেয়েটাকে রেখে চলে যেতে?

আমি বললাম,”ত্রপা,আমি সরি।

ত্রপা বললো,”আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।

ত্রপাকে রিকশা করে দিয়েছি। অনেক রিকশার ভিড়ে হারিয়ে যেতে থাকা রিকশাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছি বাসায় কী বলবো। এমন কিছু একটা বলতে হবে যাতে ওরা ত্রপাকে আর বিরক্ত না করে। সেই কিছু একটা কী হতে পারে ভাবছি,আমি ভাল গল্প বানাতে পারি না।

সমস্যা হচ্ছে,মায়াবতী তার মায়া বিস্তার করে ফেলেছে। আমার ধারণা, পৃথিবীতে এক মায়ার চক্র চলছে। ত্রপা এখনো শুভর মায়ায় পড়ে আছে, সে সেখান থেকে বের হতে পারবে না সহজে, সে চাচ্ছেও না বের হতে। মাঝখান থেকে আমি ত্রপা নামের মেয়েটির মায়ায় পড়ে গেছি। আমিও বের হতে পারছি না। বাসায় আবার ঘটা করে পাত্রী দেখার ধুম পড়বে। আমি আর এর মধ্যে নেই।

আমি অপেক্ষা করবো। কোন এক বিকালে হয়তো অনেক সাহস সঞ্চয় করে ত্রপাকে বলতে পারবো,”আপনি যদি কখনো আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন,আপনি কি আমাকে একটু জানাবেন? আমি অপেক্ষা করতে রাজি আছি। আপনার এক পৃথিবী দুঃখের ছোট্ট একটু ভাগ কি আপনি আমাকে দেবেন,প্লিজ?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *