বাসর রাতের মিষ্টি প্রেমের গল্প ২০২২

(মিষ্টি প্রেমের গল্প ) ঘরময় ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। ফুলের গন্ধ যে এত চমৎকার হতে পারে আমার ধারণা ছিলনা। অবশ্য থাকার কথাও না। জীবনে ফুল পেয়েছি মোটে একবার। কলেজের নবীন বরণের দিন।রজনীগন্ধার সেই স্টিকটার গন্ধ তো দূরে থাক প্রাণ বলতেও কিছু ছিলনা। ফুল সম্পর্কে আমার জানা শোনাও খুব কম। এই মুহূর্তে আমার ঘরটিকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। এর কৃতিত্ব অবশ্য আমার অফিসের বাবুল মিয়ার। আমার বিয়ের কথা বলতেই বিপুল আগ্রহে বলে উঠলেন, স্যার বাসর ঘর ফুল দিয়া সাজানোর কাজটা আমি করমু। আমার বাড়ির পাশেই ফুলের পাইকারি বাজার। আর এহানেও শাহবাগে আমার ভাইস্তার দোকান আছে।আপনে কিন্তু মানা করতে পারবেন না।

এত আগ্রহ দেখে আমি আর মানা করিনি। দুইদিন আগে সকালে সে সতের রকমের ফুলের লিস্ট নিয়ে হাজির। দেশে যে এত ধরনের ফুল পাওয়া যায় এটাও জানতাম না। এখন ঘরটা দেখে মনে হচ্ছে কাজটা নেহায়েত সহজ ছিলনা। প্রাথমিক রংগুলোর কোন রঙ বাদ পড়েছে বলে মনে হয়না। বাবুল মিয়াকে বেশ বড়সড় একটা ধন্যবাদ দিতে হবে। দাওয়াত দিয়েও খাওয়ানো যায় একদিন। লোকটার ভালো পরিশ্রম গিয়েছে স্বীকার করতেই হবে।

আমি অবাক হচ্ছি মেয়েটাকে দেখে। ফুলের দিকে তার কোন আগ্রহ নেই। না থাকাতে কোন দোষ নেই। মেয়েটা নিজেই ফুল হয়ে এসেছে আমার জীবনে। প্রচণ্ড যত্নে বেড়ে ওঠা কোন অর্কিডের মত মেয়েটা নিজের মত থাকবে। আমি শুধু ওর দায়িত্বের ভারটুকু নিতে পেরেই খুশি। মেয়েটা এখন অবাক বিস্ময়ে পুরো ঘর তাকিয়ে দেখছে। অবশ্য দেখারই কথা। ওকে চমকে দেবার জন্যই এ ঘরের পরতে পরতে আমি বিস্ময় গড়ে রেখেছি।

মিষ্টি প্রেমের গল্প ২০২২

মেয়েটির আমাকে পছন্দ হয়নি। আমি তেমন কেনো, মোটেই সুদর্শন নই। প্রত্যেক মেয়েই এক সুদর্শন রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে। এ চাওয়া দোষের না। সৃষ্টিকর্তা যে পরিমাণ রূপ একটা মেয়েকে দিয়ে পাঠান তার ক্ষীণ ভাগও ছেলেদের দেয়া হয়না। যাদের দেয়া হয় আমি সেসব ছেলেদের দলে পড়িনি। রোগা পাতলা,মাথায় সামান্য কিছু চুল। দৃষ্টিতে নেই কোন প্রাণ, ছোট খাটো উচ্চতা। কি জানি কতরাত মেয়েটা সৃষ্টিকর্তার সাথে অভিমান করে বসে এ নিয়ে। সে হিসেবে এ মেয়ে যথেষ্ট রূপবতী। ওর মন কথা বলে, দৃষ্টি কথা বলে। ওর হাসি শুধু ঠোঁটের কোণে থাকেনা, ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে, সে হাসিতে রিনঝিন এক শব্দ হয়। আমার বড় ভালো লাগে শুনতে। মেয়েটার চোখে আছে লাজুকতা।

এ সবই আমাকে আবিষ্কার করতে হয়েছে অনেক কষ্ট করে। আমার সাথে যতবার আলাপ হয়েছে নিজেকে যথেষ্ট শক্ত আর নিষ্প্রাণ করে রেখেছে মেয়েটা। “তোমাকে আমার মোটেই পছন্দ হয়নি” কথাটা বুঝিয়ে দেয়ার প্রানান্ত এক চেষ্টা। এর সাথে মনে মনে না জানি কতনা বিশেষণ যোগ করে কে জানে। আমার হাসি পায়। আমার বেসুরা গলায় বলতে ইচ্ছে করে, “আমি তোমারো সনে বেঁধেছি আমার এ প্রাণ”। আমি বলিনা। আমি অপেক্ষা করছি এ মেয়েটার ভালোবাসার জন্য। একক ভালোবাসা বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। ভালোবাসার জন্মই হয় দুজন মানুষের মাঝে ভাগ হবার জন্য।

বিয়ের দুই সপ্তাহ আগের কথা। আমি ওর জন্য বিয়ের শাড়ি কিনতে গেলাম। আজকাল বিয়ের শাড়ি দুজন মিলেই পছন্দ করে। আমি গেলাম একা একা, কাউকে না জানিয়ে। অনেক খুঁজে কিনলাম কালো রঙের একটা শাড়ি। পুরোটা কালো জমিন, তার মধ্যে লাল কাজ করা, লাল পাড়। জমিন জুড়ে কি সুন্দর সুন্দর লাল পাথর। বিদেশি কোন পাথর হবে নিশ্চয়ই। এ শাড়ি কিনতে আমার খরচ হল বেতনের অর্ধেক, সময় লাগল কয়েক ঘণ্টা। তবে বিয়ের শাড়ি কেউ কখনো কালো কিনেনা। বিয়ে হল আনন্দ, আনন্দের রং কালো হতে পারেনা। আমার পছন্দ দেখে ওর কষ্টের সীমা ছিলনা। একের পর এক অপছন্দের কাজ আমি করেই যাচ্ছি। তবে আমার এ শাড়ীর পিছনে একটা গল্প ছিল।

ওর এক বান্ধবীর বিয়েতে কালো শাড়ি পড়েছিল মেয়েটা। কি যে সুন্দর লাগছিল দেখতে। যেন পৃথিবীর সব রূপ কৃষ্ণ গহ্বরের মত নিজের দিকে টেনে নিয়েছিল সেদিন। সদ্য কিশোর বয়সে পা রাখা বালকের মত কয়েক লাইনের একটা কবিতাও লিখতে ফেলি সে রাতে।

সেরা প্রেমের গল্প

মিষ্টি প্রেমের গল্প 2022

“তার শরীর জুড়ে এক টুকরো কৃষ্ণকায় আকাশ

তারার মত কৃষ্ণচূড়ার লাল ছেয়ে আছে আঁচল পাড়

ঝুমকো দুলের সাথে রিনিঝিনি চুড়ি,গলা জড়ানো গোলাপ সুতার মালা

বাঁধানো কেশের নেশা যেন একগুচ্ছ পানসীলতা।

ইন্দ্রাবতী হাসছে,

কোমল গালের বিন্দু টোলে খেলা করে রাঙানো অধর আনন্দ

আমি ভিজে চলেছি বৃষ্টিতে

যেন ইন্দ্রাবতীর রূপালি জোছনা আমায় ভিজিয়ে চলেছে অবিরত।“

আমি রাত তিনটায় ওকে ফোন দিয়ে বসি।যথেষ্ট বিরক্তি নিয়ে ঘুম ঘুম কণ্ঠে ও বলে,

এত রাতে? কি ব্যাপার?

-তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল আজ। অনেক সুন্দর।

-এটা বলার জন্যই কি ফোন দেয়া?

-হ্যাঁ। সুন্দরের কথা বলে দিতে হয়। আটকে রাখতে হয়না।

-তাই বলে রাত তিনটায়? এ সময়ে মানুষ মৃত্যু সংবাদ দিতে ফোন দেয়, সুন্দরের জন্য না তা কি আপনি জানেন?

আমি এরপর কোন কথা বলিনি। কবিতা শোনানো তো দূরে থাক! সে রাতে আমার প্রচণ্ড খারাপ লেগেছিল। এতই খারাপ যে জ্বর পর্যন্ত এসে গিয়েছিল। সে জ্বরে তিনদিন আমি অফিস যেতে পারিনি। মেয়েটি আমায় দেখতে আসেনি। ভদ্রতার নিয়মে পড়ে খোঁজ নিয়েছিল দুবার। ভদ্রতার নিয়ম বড়ই অনিচ্ছার নিয়ম।

এরপরও মহাউৎসাহে আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ওর পছন্দ অনুযায়ী শাড়ি কেনা হয়েছে। ভালোবাসা জয় করার নেশা আনন্দের নেশা। আমি এ নেশা মেয়েটার মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চাই। তারই খুব অল্প কিছু ভাগ আমি রেখেছি আমার বাসর ঘরটাতে।

এবার একটা ছোটখাটো বর্ণনা দেয়া যাক ঘরটার। আমার ঘরের সিলিঙের রং নীল। গাঢ় নীল না, সাগরের তীরে শুয়ে আকাশ দেখতে যেমন লাগে তেমন নীল। এ রঙটা মেয়েটার ঘরের সিলিঙের মত। দুই বছর আগে ওর ঘরে এ রং করা হয়েছিল। আমিও খোঁজ নিয়ে আমার ঘরের আকাশকে সেরকম করে নিলাম। অপরিচিত একটা মানুষের সাথে একই বিছানায় থেকে যখন দৃষ্টি উদাস করবে, মন খারাপে যখন বিষণ্ণ হবে তখন সিলিংটা দেখেই ভাববে এ তো আমারই ঘর, আমার নিজের আকাশ।

আমার ঘরের বাম দিকের দেয়ালটা জুড়ে ওর বেড়ে উঠার গল্প, ছোট থেকে বড় বেলায় আসার গল্প। ছোট বেলার ছবিটা জোগাড় করেছি আমার শ্বাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে। এ ছবি বড় যত্নে তিনি রেখে দিয়েছেন নিজের আলমারিতে। আমি আরেকটা কপি প্রিন্ট করে বাঁধাই করে নিয়েছি। দ্বিতীয় ছবিটা ওর কলেজ জীবনের। এ ছবিতে ওর বালিকাসুলভ আচরণ স্পষ্ট। ছবির উৎস ফেসবুক। ফটো ক্রেডিট পাওয়া যায়নি। পেলে তাকে এই অসাধারণ মুহূর্তটি বন্দী করার জন্য একটা ধন্যবাদ অবশ্যই দিতাম। তৃতীয় ছবিটা গায়ে হলুদের।

প্রথম প্রেমের গল্প

আমার প্রানপ্রিয় শ্যালক এই কাজটি করেছেন। হাতে মেহেদি দেয়া, গালে হলুদ, হাসি জুড়ে প্রাণের ছুটাছুটি। এত সুন্দরও মানুষ হয়? তবে মেয়েটা এতটাই সুন্দর। তার পরের ছবিটা আমাদের বিয়ের। কয়েক ঘণ্টা আগের তোলা। আমার ভাইকে দায়িত্ব দিয়েছি যে করেই হোক কাজটা করতে হবে। পাগলের ভাই পাগলই হবে। সে মহাউৎসাহে ছবি ফ্রেমিং করে টানিয়ে দিয়েছে। আমি নিশ্চিত এই পাগলামির মাশুল স্বরুপ আগামী মাসেই একটা নতুন ফোনের খরচ দিতে হচ্ছে আমাকে। তবু আমি খুশি। ছবিটা বন্ধনের সাক্ষী আমাদের।

একদিন নিজের শাড়ীর আঁচলে ছবিটা মুছতে মুছতে মেয়েটা বলে উঠবে,”কতটা বছর হয়ে গেলো।” শেষ ছবিটা ওর আঠারো বছর বয়সের। নীল জামদানি পড়া। জলরঙা ছবি। ছবিটা করেছে আমার বন্ধু সৈকত। টাকা নিতে চায়নি। বিয়ের উপহার হিসেবেই দিতে চেয়েছিল। তা কি আর হয়? আমার বড় যত্ন করে গড়ে তোলা, সাজিয়ে তোলা ঘর।

ঘরের ডানদিকের দেয়ালটা আরও ইন্টারেস্টিং। এ দেয়ালে আমি অসংখ্যবার লিখেছি “আমি তোমাকে ভালোবাসি”। একাই লিখেছি। কোন এক সকাল থেকে দুজন মিলে প্রতিদিন একবার লিখব। এ ব্যাপারটা ওকে বলা হয়নি। যেদিন জিজ্ঞেস করবে সেদিন বলব। ও বিরক্ত ভাব মুখে ধরেই আনন্দের সাথে কাজটা করবে জানি। পাগলামিকে প্রশ্রয় দিতে হয়না। ব্যতিক্রম শুধু ভালোবাসার পাগলামি। এ পাগলামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে উপায় থাকেনা।

ঘর ছাড়ার কাজ কঠিন কাজ। চাকরীর প্রথম জীবনে যখন শহরের বাইরে যেতে হল আমি বুঝেছিলাম কতটা কষ্ট হয়েছিল, খারাপ লেগেছিল। তখন মনকে বুঝিয়েছিলাম কিছুদিন যাক। একটা ব্যবস্থা হবে। আর সেখানে মেয়েটা আজীবনের জন্য নিজের ঘর ছেড়ে এসেছে। তাকে নতুনভাবে গ্রহণ করে নিতে হবে এ আশ্রয়। আমি যথেষ্ট চেষ্টা করছি এ ঘরকে ওর আপন করে তুলতে। অপরিচিত হয়েও নিজেকে ওর কাছে বহুদিনের পরিচিত করে তুলতে। আমি পারব কিনা জানিনা। তবু চেষ্টা করব। আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম। মৃদু স্বরে বললাম, “তোমার আহত হবার কিছু নেই। এ তোমারই বাড়ি। বিশ্বাস করো, খুব সহজেই তুমি সবাইকে আপন ভাবতে শুরু করবে। এ বাড়ির সবাই তোমাকে অত্যন্ত পছন্দ করে। এ খবরটা তুমি জানোনা।”

মেয়েটি তার গাঢ় মেহেদি রাঙা হাতে আমার হাতটা ধরল। ঘরে প্রজ্জ্বলিত অনেকগুলি মোমের আলোয় মেয়েটির রূপকে কিভাবে প্রকাশ করতে হয় তা আমার মত সাধারণ ছাপোষা মানুষের জানা নেই। ওর গাঢ় কাজল দেয়া চোখ টলটল করছে। এতক্ষন চুপ করে থাকা মেয়েটি এই প্রথম সে আমার সাথে কথা বলল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে প্রবল ভরসায় সে জিজ্ঞেস করল, বাকিটা জীবন একই ভাবে আমায় ভালবাসবেতো তো? এক ফোঁটা অশ্রুজল আমার হাতে পড়ল।

আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসি দিলাম। এই হাসির শব্দ নেই, তবে ভাষা আছে, অর্থ আছে। সে ভাষায় স্পষ্ট করে লিখা আছে, ও মেয়ে, তোমার পাশে আমি সারাজীবন থাকতে বাধ্য, তোমার সাথে জন্মান্তরের বন্ধনে আমি বন্দী। সৃষ্টিকর্তার নামে যুগ যুগান্তর আগেই আমি সে শপথ করে রেখেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *